ZamZam Travels BD Loading

হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ কী? ইহরাম অবস্থায় জরুরি বিধিনিষেধ

জানুন হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ কী, ইহরাম অবস্থায় কোন কোন কাজ হারাম, এবং হাজিদের জন্য কোন বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি।

  1. Home
  2. Blog
  3. হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ কী? ইহরাম অবস্থায় জরুরি বিধিনিষেধ
Back to blogs May 25, 2025
হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ কী? ইহরাম অবস্থায় জরুরি বিধিনিষেধ

হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ কী? ইহরাম অবস্থায় জরুরি বিধিনিষেধ

 

হজ ইসলামের অন্যতম মহান ইবাদত। এটি শুধু একটি সফর নয়; বরং আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা এবং পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা হজের ঘোষণা সম্পর্কে বলেন যে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে তাঁর ঘরের দিকে আসবে, যাতে তারা নিজেদের উপকার প্রত্যক্ষ করতে পারে এবং নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (Quran.com)

তবে হজের এই পবিত্র সফরে কিছু কাজ রয়েছে, যা বিশেষভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে ইহরাম বাঁধার পর একজন হাজিকে কিছু বিষয় থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হয়। এই বিধিনিষেধগুলো কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়; বরং বান্দাকে সংযম, বিনয়, তাকওয়া ও ইবাদতের গভীরতায় প্রবেশ করানোর জন্য। ইসলামিক ফিকহে ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (Islam-QA)

 

হজে নিষিদ্ধ কাজ বলতে কী বোঝায়?

হজে নিষিদ্ধ কাজ বলতে সাধারণত ইহরাম অবস্থায় সেইসব কাজকে বোঝায়, যা একজন হাজি বা মুআহরিমের জন্য শরয়ীভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু নিষেধাজ্ঞা পুরুষ-নারী উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, আবার কিছু বিষয় শুধু পুরুষের জন্য বা শুধু নারীর জন্য প্রযোজ্য। আলকাউসারের আলোচনায়ও বলা হয়েছে, হজের সময় অশ্লীলতা, গুনাহ এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা বিশেষভাবে জরুরি। (Alkawsar)

 

১. অশ্লীল কথা, যৌন আচরণ ও কামনামিশ্রিত ব্যবহার

হজের সময় সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞার একটি হলো রফাস, অর্থাৎ অশ্লীল কথা, যৌন ইঙ্গিত, যৌন আলোচনা বা যৌন সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায় এমন আচরণ। সূরা আল-বাকারাহ ২:১৯৭-এ আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, হজে যেন না থাকে যৌন আচরণ, না থাকে গুনাহ, না থাকে ঝগড়া-বিবাদ। আলকাউসারের ব্যাখ্যায় এসেছে, এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে যৌন উত্তেজনামূলক কথাও এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। (Quran.com)

তাই শুধু শারীরিক সম্পর্কই নয়, চুম্বন, স্পর্শ, কামনামিশ্রিত আলাপ বা যৌন উসকানিমূলক ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে হবে। ইসলামকিউএ-র ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়ের তালিকাতেও যৌন সংসর্গ এবং কামনাসহ স্পর্শকে গুরুতর নিষিদ্ধ বিষয় বলা হয়েছে। (Islam-QA)

২. ঝগড়া, তর্ক, গালিগালাজ ও খারাপ ব্যবহার

হজের সফর ধৈর্য, সহনশীলতা এবং উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেয়। তাই ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক, কটু কথা, গালিগালাজ, অপমান, চিৎকার বা মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার হজের আদবের বিরোধী। কুরআনের একই আয়াতে “জিদাল” বা বিবাদ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। (Quran.com)

এর মানে এই নয় যে কেউ কোনো জরুরি কথা বলবে না; বরং অহেতুক তর্ক, রাগের প্রকাশ, বিবাদ এবং মানুষের কষ্টের কারণ হওয়া থেকে বাঁচতে হবে। আলকাউসারও হজের সময় সচরাচর ভুলের মধ্যে উদাসীনতা, বিরোধ এবং আচরণগত ত্রুটির দিকে সতর্ক করেছে। (Alkawsar)

৩. চুল, পশম বা নখ কাটা

ইহরাম অবস্থায় শরীরের চুল, পশম বা নখ কাটা নিষিদ্ধ। ইসলামকিউএ-র সারসংক্ষেপে মাথার চুল অপসারণকে প্রধান নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর একটি বলা হয়েছে, আর আলকাউসারের বাংলা আলোচনায় স্পষ্টভাবে চুল, পশম ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। (Islam-QA)

এটি ইহরামের একটি সুপরিচিত বিধান। তাই মাথা, দাড়ি, বগল, শরীরের অন্য অংশের চুল বা নখ কাটতে হলে ইহরাম শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যদি না শরয়ী কোনো বিশেষ ওজর থাকে। (Islam-QA)

৪. সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার

ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এটি শরীরে, কাপড়ে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত কোনো সুগন্ধি দ্রব্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইসলামকিউএ-তে এটি ইহরামের মৌলিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ আছে। (Islam-QA)

আলকাউসারের ব্যাখ্যাতেও আতর বা সুগন্ধি লাগানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তাই হজে যাওয়ার আগে এবং ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধিযুক্ত সাবান, লোশন, তেল বা পারফিউম ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। (Alkawsar)

৫. শিকার করা

ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ। আলকাউসার ও ইসলামকিউএ—দুই জায়গাতেই এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মনে রাখতে হবে: “প্রত্যেক প্রাণী হত্যা” — এভাবে সাধারণীকরণ ঠিক নয়। মূল নিষেধাজ্ঞা হলো শিকারযোগ্য স্থলজ প্রাণী শিকার করা। ক্ষতিকর কিছু প্রাণী নিরাপত্তার জন্য হত্যা করার ব্যতিক্রম রয়েছে। (Islam-QA)

তাই ব্লগে “পাখি, পোকা, সব প্রাণী, ছোট-বড় কিছুই মারা যাবে না” — এভাবে বলার চেয়ে “শিকার করা নিষিদ্ধ; তবে ক্ষতিকর প্রাণীর ক্ষেত্রে আলাদা হুকুম আছে” — এভাবে বলা বেশি সঠিক। (Islam-QA)

৬. পুরুষদের জন্য সেলাই করা বা দেহ-অনুযায়ী তৈরি পোশাক পরা

ইহরাম অবস্থায় পুরুষদের জন্য শার্ট, প্যান্ট, আন্ডারওয়্যার, মোজা বা শরীরের অঙ্গ অনুযায়ী তৈরি পোশাক পরা নিষিদ্ধ। ইসলামকিউএ-র ব্যাখ্যায় “সেলাই করা কাপড়” বলতে এমন পোশাক বোঝানো হয়েছে, যা শরীর অনুযায়ী তৈরি। (Islam-QA)

এই কারণেই পুরুষদের জন্য ইহরামের দুই খণ্ড কাপড় পরার বিধান রয়েছে। জুতা বা স্যান্ডেলের ক্ষেত্রেও পুরো পা ও গোড়ালি ঢেকে ফেলে এমন জুতা সম্পর্কে বিশেষ বিধান রয়েছে। (Islam-QA)

৭. পুরুষের মাথা ঢেকে রাখা

ইহরাম অবস্থায় পুরুষদের জন্য মাথা ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ। টুপি, পাগড়ি বা এ ধরনের আবরণ ব্যবহার করা যাবে না। ইসলামকিউএ-র ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয় ও সংশ্লিষ্ট আলোচনাগুলোতে এ বিধান স্পষ্টভাবে এসেছে। (Islam-QA)

৮. নারীর জন্য নিকাব বা বোরকা পরা

ইহরামে নারীরা সাধারণ শালীন পোশাক পরবেন, কিন্তু মুখমণ্ডল-ফিটিং নিকাব বা বোরকা পরবেন না। ইসলামকিউএ-তে নারীর ইহরাম সম্পর্কিত মাসআলায় এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে পরপুরুষের সামনে প্রয়োজনে ঢিলেঢালা কাপড় নামিয়ে মুখ আড়াল করার আলাদা আলোচনা রয়েছে। (Islam-QA)

অতএব “মহিলাদের অতিরিক্ত সাজগোজ নিষিদ্ধ” — এ ধরনের সাধারণ বাক্যের চেয়ে “ইহরামে নিকাব ও সুগন্ধি থেকে বিরত থাকতে হবে, তবে শালীন পোশাক পরা যাবে” — এভাবে বলা বেশি নির্ভুল। (Islam-QA)

৯. হজের সময় সাধারণ গুনাহ থেকেও বাঁচতে হবে

হজের নিষিদ্ধ কাজ মানে শুধু ইহরামের কারিগরি কিছু মাসআলা নয়। বরং গীবত, মিথ্যা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, কুদৃষ্টি, অহংকার, ঠেলাঠেলি, প্রতারণা, রাগ, বিদ্বেষ—এসব থেকেও বাঁচতে হবে। আলকাউসার এই বিষয়টিকে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছে: ইহরামের বিশেষ গুনাহ যেমন চুল কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার বা শিকার করা থেকে যেমন বিরত থাকতে হবে, তেমনি সাধারণ গুনাহ থেকেও দূরে থাকতে হবে। (Alkawsar)

 

কোন বিষয়গুলো “হজের বিশেষ নিষেধাজ্ঞা” নয়?

আপনার খসড়ায় “মদ, শূকরের মাংস, হারাম খাবার” অংশটি এসেছে। এগুলো অবশ্যই ইসলামে হারাম, কিন্তু এগুলো শুধু হজের সময়ের বিশেষ নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং সব সময়ই হারাম। তাই “হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ” শিরোনামের অধীনে এগুলোকে মূল তালিকায় রাখলে বিষয়টি কিছুটা মিশে যায়। ইহরামের মানক নিষিদ্ধ তালিকায় এগুলো আলাদাভাবে থাকে না। (Islam-QA)

একইভাবে “যুদ্ধে অংশগ্রহণ” কথাটিও হজের নিষিদ্ধ বিষয় বোঝাতে খুব উপযুক্ত ভাষা নয়, যদি না আপনি তা “ঝগড়া-বিবাদ, সহিংসতা ও আক্রমণাত্মক আচরণ” অর্থে ব্যবহার করেন। হজের আলোচনায় মূল নিষেধাজ্ঞা হলো বিবাদ, গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচা। (Quran.com)

 

উপসংহার

হজে নিষিদ্ধ কাজসমূহ জানা প্রতিটি হাজির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ হজ কেবল কাবা শরিফে গিয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নাম নয়; বরং এটি এমন এক ইবাদত, যেখানে শরীর, মন, চরিত্র ও আমল—সবকিছু আল্লাহর আনুগত্যে সঁপে দিতে হয়। ইহরাম অবস্থায় যৌন আচরণ, অশ্লীলতা, ঝগড়া, চুল-নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, শিকার করা, পুরুষের জন্য সেলাই করা পোশাক পরা, মাথা ঢেকে রাখা, এবং নারীর জন্য নিকাব পরা—এসব বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে। 

সঠিক হজের জন্য শুধু নিয়তই যথেষ্ট নয়; দরকার সঠিক মাসআলা জানা এবং ভুল থেকে বাঁচা। আলকাউসারও হজের সঠিক মাসআলার জ্ঞানকে অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হজের আদব, বিধান ও নিষেধাজ্ঞাগুলো বুঝে সঠিকভাবে হজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।