ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কি হজে যেতে পারবে? ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক ব্যাখ্যা
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। তবে এটি সবার ওপর সমানভাবে ফরজ নয়। আল্লাহ তাআলা হজ ফরজ করেছেন তাদের ওপর, যারা এতে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে। তাই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো: তিনি কি শরয়ী অর্থে “সক্ষম” আছেন, নাকি নেই? ইসলামী ফিকহে এই সক্ষমতার মধ্যে শুধু শরীর নয়, আর্থিক অবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।
আপনার লেখায় সূরা আন-নিসা ৪:২৯-এর আয়াতটি অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ না করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তবে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির হজ ফরজ হওয়া বা না হওয়ার মূল আলোচনায় আলেমরা সাধারণত সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭-এর “সামর্থ্য” শর্তটিকেই কেন্দ্র করে ব্যাখ্যা করেন।
ঋণ থাকলে কি হজ ফরজ হয়?
যদি একজন ব্যক্তির ওপর এমন ঋণ থাকে যা এখনই পরিশোধ করা জরুরি, এবং সে যদি ঋণ শোধ করার পর হজের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না রাখে, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ নয়। এ ক্ষেত্রে আগে ঋণ শোধ করাই প্রধান দায়িত্ব। ইসলামকিউএ এবং ইসলামওয়েব—দুই জায়গাতেই এই নীতি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
কেন আগে ঋণ শোধ করতে হবে?
কারণ ঋণ মানুষের হক-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। হজ মহান ইবাদত হলেও, কারও প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখে নফল বা এমনকি ফরজ ইবাদতে অগ্রসর হওয়া সবসময় সঠিক নয়। ইসলামওয়েব বলছে, যদি একজন ব্যক্তি ঋণও শোধ করতে পারে এবং হজের ব্যয়ও বহন করতে পারে, তাহলে সে হজ করবে; কিন্তু যদি দুটো একসঙ্গে সম্ভব না হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধ অগ্রাধিকার পাবে।
আলকাউসারের একটি প্রবন্ধেও একই নীতি এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কেউ যদি নফল হজ করতে চায় অথচ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে বা ঋণদাতা ঋণ চাইছে, তাহলে তার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে ঋণ আদায় করা; নইলে অন্য দিক থেকে গুনাহর পাল্লা ভারী হতে পারে।
ঋণ থাকলেও কখন হজে যাওয়া যাবে?
সব ঋণের হুকুম এক নয়। যদি কারও কাছে এত অর্থ থাকে যে সে ঋণও পরিশোধ করতে পারবে, আবার হজের খরচও চালাতে পারবে, তাহলে তার হজে যেতে বাধা নেই। বরং এ অবস্থায় তার ওপর হজ ফরজ হতে পারে। ইসলামওয়েব এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলেছে। (Islamweb)
আবার যদি ঋণটি দীর্ঘমেয়াদি হয়, এখনই পরিশোধ করার সময় না আসে, এবং ব্যক্তি নিশ্চিত থাকে যে সময়মতো সে ঋণ শোধ করতে পারবে, তাহলে কিছু আলেমের মতে সে হজে যেতে পারে। ইসলামওয়েব এ ধরনের অবস্থায় কিছুটা সহজতা দেখিয়েছে।
ঋণদাতার অনুমতি থাকলে কী হবে?
যদি ঋণ এমন হয় যা শিগগির পরিশোধযোগ্য, বা হজ থেকে ফেরার আগেই যার মেয়াদ এসে যায়, তাহলে ইসলামওয়েব বলছে—ঋণদাতার অনুমতি ছাড়া হজে যাওয়া উচিত নয়। আর ইসলামকিউএ-তে বলা হয়েছে, ঋণদাতা যদি অনুমতি দেন, তাহলে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির হজে যাওয়াতে অসুবিধা নেই, এবং এতে তার হজের বৈধতা নষ্ট হয় না।
তবে এই অনুমতির বিষয়টি এমন অবস্থায় বেশি প্রযোজ্য, যখন ঋণদাতার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বা সে নিজেই স্বেচ্ছায় সময় দিচ্ছে।
ঋণ নিয়ে হজ করলে হজ কি সহিহ হবে?
এখানেও একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ঋণ থাকা নিজে নিজে হজকে বাতিল করে না। ইসলামকিউএ-র একটি উত্তরে বলা হয়েছে, কেউ যদি মানুষের কাছে ঋণী অবস্থায় হজ করে, এবং হজের সব রুকন ও শর্ত পূর্ণ করে, তাহলে তার হজ সহিহ হতে পারে; কারণ ঋণ থাকা হজের বৈধতার শর্ত নয়। কিন্তু এমন ব্যক্তির জন্য ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়াই উত্তম, কারণ শরয়ী অর্থে সে তখন সম্পূর্ণ “সক্ষম” হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।
অর্থাৎ, “ঋণ থাকলে হজ একেবারেই হবে না” — এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং সঠিক কথা হলো: ঋণ থাকলে আগে দেখতে হবে সেই ঋণ তার সামর্থ্যকে নষ্ট করছে কি না।
নফল হজের ক্ষেত্রে হুকুম আরও কঠোর
একবার ফরজ হজ আদায় হয়ে গেলে পরে যে হজ করা হয়, তা নফল। এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য সতর্কতা আরও বেশি। আলকাউসার বলছে, নফল হজ করতে গিয়ে যদি ঋণদাতার কষ্ট হয় বা প্রাপ্য অর্থ আটকে যায়, তাহলে সে নফল হজের বদলে গুনাহের দিকে চলে যেতে পারে।
তাহলে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির করণীয় কী?
সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ শরয়ী সিদ্ধান্ত হলো:
-
আগে নিজের ঋণের ধরন বুঝুন — তা কি এখনই পরিশোধযোগ্য, নাকি দীর্ঘমেয়াদি।
-
যদি ঋণ শোধের পর হজের টাকা না থাকে, তাহলে আপনার ওপর এখন হজ ফরজ নয়।
-
যদি ঋণও শোধ করতে পারেন, হজও করতে পারেন, তাহলে হজ করা যাবে।
-
যদি ঋণদাতা অনুমতি দেন, কিছু ক্ষেত্রে যাওয়া জায়েজ হতে পারে।
-
নফল হজের আগে মানুষের হক, দেনা, পরিবার ও জরুরি দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।
উপসংহার
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কি হজে যেতে পারবে? — এর উত্তর হলো, অবস্থাভেদে পারবে, আবার নাও পারবে। যদি ঋণ তার আর্থিক সামর্থ্যকে নষ্ট করে, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ নয় এবং আগে ঋণ শোধ করতে হবে। কিন্তু যদি সে ঋণও শোধ করতে পারে, আবার হজের ব্যয়ও বহন করতে পারে, তাহলে সে হজে যেতে পারবে। আর কিছু ক্ষেত্রে ঋণদাতার অনুমতিও বিষয়টিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই এই বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক নীতি হলো: হজের আগে নিজের আর্থিক দায়িত্ব পরিষ্কার করুন, ঋণকে হালকাভাবে নেবেন না, এবং সামর্থ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই হজের প্রস্তুতি নিন। এটাই শরয়ী ভারসাম্যের কাছাকাছি অবস্থান।